২০২৬ সাল

জিডিপির নিরিখে এক ধাপ পিছিয়ে পড়বে জাপান?

দুর্বল ইয়েন, স্থবির উৎপাদনশীলতা ও জনসংখ্যা হ্রাসের দীর্ঘমেয়াদি চাপ মিলিয়ে এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে জাপানের অর্থনীতি।

দুর্বল ইয়েন, স্থবির উৎপাদনশীলতা ও জনসংখ্যা হ্রাসের দীর্ঘমেয়াদি চাপ মিলিয়ে এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে জাপানের অর্থনীতি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, নমিনাল জিডিপির হিসাবে ২০২৬ সালে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতিতে নেমে আসতে পারে জাপান। আর চতুর্থ অবস্থানে উঠে আসতে পারে ভারত। এতে বৈশ্বিক অঙ্গনে জাপানের প্রভাব কমে আসতে পারে। এমন আবহে মার্কিন বাণিজ্যনীতি, চীনের সঙ্গে টানাপড়েন ও প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সম্প্রসারণমূলক রাজস্ব কৌশল মিলিয়ে জাপানের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির পথ ক্রমেই আরো অনিশ্চিত হয়ে উঠছে বলে অভিমত বিশ্লেষকদের। খবর কিয়োদো।

দুর্বল এ অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে চলতি বছরের মাঝামাঝিতে প্রকাশ হতে যাওয়া জাপানি প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির ‘প্রবৃদ্ধি কৌশল’ আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে ক্রমে সংকুচিত জনসংখ্যার চাপ মোকাবেলা করে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং সম্ভাবনাময় নতুন খাতে বিনিয়োগ জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা।

সরকারি তথ্যানুযায়ী, টানা ছয় প্রান্তিকের মধ্যে গত জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে প্রথমবারের মতো সংকুচিত হয়েছে জাপানের অর্থনীতি। এর অন্যতম কারণ ছিল রফতানি দুর্বলতা। মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরোপিত উচ্চ শুল্কের কারণে খাতটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অর্থনীতিবিদদের ধারণা, চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্র-জাপানের মধ্যে একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি কার্যকর হতে পারে। এতে জাপানের অর্থনীতি মাঝারি মাত্রার পুনরুদ্ধারের ধারায় ফিরতে পারে। চলতি বছর করপোরেট মুনাফা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকবে, যা মূলধনি ব্যয় বাড়াতে সহায়তা করবে। পাশাপাশি টেকসই মজুরি বৃদ্ধিও বজায় থাকবে, যা জিডিপির দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) বিশ্লেষণ অনুসারে, চলতি বছরে জাপানের অর্থনীতি প্রায় দশমিক ৯ শতাংশ বাড়তে পারে। এতে ভূমিকা রাখবে সানায়ে তাকাইচির সম্প্রসারণমূলক রাজস্বনীতি ও প্রকৃত ব্যয়যোগ্য আয়ের বৃদ্ধি।

তবে মিজুহো রিসার্চ অ্যান্ড টেকনোলজিসের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ইউসুকে কোশিয়ামা বলছেন, ‘জাপানের অর্থনীতি বর্তমানে দুটি বড় ঝুঁকির মুখে রয়েছে। ইয়েনের অবমূল্যায়ন ও চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক উত্তেজনা।’

কোশিয়ামার মতে, সরকারি ব্যয় পরিকল্পনা পরিবারগুলোকে মূল্যস্ফীতি চাপ সামলে নিতে সাহায্য করবে। কিন্তু সরকারের ওপর ঋণ চাপ তৈরি হওয়ায় ইয়েনের দাম কমছে। এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘দুর্বল ইয়েন আমদানি ব্যয় বাড়াতে এবং মূল্যস্ফীতির হার আরো ঊর্ধ্বমুখী করতে পারে। ইয়েনের অবমূল্যায়ন তৈরি করবে মূল্যস্ফীতির চাপ, যা মূল্যবৃদ্ধি মোকাবেলায় সরকারি উদ্যোগের প্রভাবকে খর্ব করতে পারে। এতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও নিম্ন প্রবৃদ্ধির মিলিত স্ট্যাগফ্লেশন তীব্র আকার ধারণ করতে পারে।’

তাইওয়ানের ওপর বেইজিং হামলা করলে তাতে টোকিও জড়িয়ে যেতে পারে বলে গত নভেম্বরে মন্তব্য করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি। এর প্রতিক্রিয়ায় নাগরিকদের জাপান ভ্রমণ এড়িয়ে চলার আহ্বান জানিয়েছে বেইজিং। কোশিয়ামার মতে, এতে জাপানে বিদেশী পর্যটক কমায় প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, করপোরেট আয়ে চাপ পড়বে এবং শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগ ও মজুরি বৃদ্ধিও প্রভাবিত হবে।

গত অক্টোবরে আইএমএফ প্রকাশিত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে বলা হয়েছিল, মার্কিন ডলারের হিসাবে মূল্যস্ফীতি সমন্বয় না করে হিসাব করা নমিনাল জিডিপির ভিত্তিতে জাপান ২০২৬ সালে ভারতের পেছনে পড়ে যাবে। দুই বছর আগে একইভাবে জার্মানির কাছে বিশ্বের তৃতীয় অর্থনীতির খেতাব হারিয়েছিল পূর্ব এশিয়ার দেশটি।

মিৎসুবিশি ইউএফজে রিসার্চ অ্যান্ড কনসালটিংয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ শিনইচিরো কোবায়াশি বলেন, ‘এ নিম্নমুখী অবস্থান বিশ্ব বাণিজ্য, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জাপানের প্রভাব সরাসরি কমিয়ে দেবে।’

কোবায়াশির ভাষায়, ‘মূল সমস্যা হলো অতীতে জাপানে বিভিন্ন সরকার নানামুখী প্রবৃদ্ধি কৌশল গ্রহণ করলেও উৎপাদনশীলতা বাড়েনি।’

এ প্রেক্ষাপটে তাকাইচি প্রশাসনের নতুন প্রবৃদ্ধি কৌশলের দিকেই এখন সবার নজর। ‘দায়িত্বশীল ও সক্রিয় সরকারি অর্থ ব্যবস্থা’ স্লোগানের অধীনে তাকাইচি প্রশাসন জাহাজ নির্মাণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্পসহ ১৭টি কৌশলগত খাতকে সহায়তা দিতে পারে। তবে দাই-ইচি লাইফ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী প্রধান অর্থনীতিবিদ হিদেও কুমানো বলেন, ‘পরিকল্পনায় পর্যটন, ডিকার্বনাইজেশন, রোবোটিকস ও চালকবিহীন গাড়ি প্রযুক্তির মতো বেশ কয়েকটি উচ্চ সম্ভাবনাময় খাত উপেক্ষিত রয়ে গেছে।’

জাপানের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য নিম্ন জন্মহার মোকাবেলায় নজর দেয়ার আহ্বান জানালেন নোমুরা রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী অর্থনীতিবিদ তাকাহিদে কিউচি। তার ভাষ্যে, ‘জনসংখ্যা দ্রুত কমছে। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে জাপানি বাজারের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি নিয়ে কোম্পানিগুলো হতাশ হয়ে পড়বে এবং দেশীয় বিনিয়োগ কমিয়ে দেবে। ফলে শ্রম উৎপাদনশীলতা কমে যাবে।’

সতর্কবার্তায় তিনি জানান, প্রণোদনা প্যাকেজের মতো বড় আকারের ব্যয়ের উৎস হবে সরকারি বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে অর্থায়ন। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তহবিল কমিয়ে দেবে এবং শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে শ্লথ করবে। জাপানের সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধিও নেমে আসবে। এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজন সরকারের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে স্থিতিশীলতা। এতে দেশীয় কোম্পানিগুলোর মধ্যে কমতে থাকা প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশা মোকাবেলা করা যাবে এবং জাপানের অর্থনৈতিক প্রভাবের ক্ষয় রোধও সম্ভব হবে।

আরও